বাবা মায়ের কাছে সবথেকে প্রিয় হলো সন্তান। কষ্ট করে রোজগার করে, আধপেটা খেয়েও প্রতিটা বাবা মা চান সন্তানকে ভালো রাখতে, তাকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে। কিন্তু সেই সন্তান যদি বিপথে চলে যায় তবে বাবা মায়ের দুঃখ কষ্টের অন্ত থাকে না। আগেকার দিনে বিপথে যাওয়া মানেই খারাপ সঙ্গের পাল্লায় পড়া বোঝাতো, কিন্তু বর্তমানে অতিরিক্ত মোবাইল অ্যাডিকশনও বিপথে যাবারই লক্ষণ। আজকে আমরা জানবো কিভাবে আপনার সন্তানের মোবাইলের প্রতি আসক্তি কমাতে পারবেন।
তার আগে একটু সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক সারাদিন মাত্রাতিরিক্ত মোবাইল (Mobile) ব্যবহারে কি কি ক্ষতি হতে পারে।
১) স্মার্টফোন আসক্তি(Addiction) হলো সেই অবস্থা, যখন আপনি প্রয়োজনে এবং প্রয়োজন ছাড়াই অতিরিক্তি মোবাইল ব্যবহার করছেন এবং ৫ মিনিট সময়ও মোবাইল ছাড়া থাকতে পারছেননা।
২) এই পরিস্থিতিতে ব্যক্তি বারবার নিজের Mobile এর মধ্যে Texts, Emails, Game, বিভিন্ন apps, internet ইত্যাদি ওপেন করে থাকেন, এছাড়া মোবাইলে Notification না আসলেও বারবার নতুন notification আসলো কিনা দেখার জন্যে মোবাইলের দিকে নজরও চলে যায়।
৩) যখন মোবাইল আসক্তিতে থাকা কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে মোবাইল সরিয়ে দেওয়া হয়, তখন তার অন্য কোনো কাজের মন বসেনা।
৪) অত্যাধিক মোবাইলের ব্যবহারের ফলে সব থেকে অধিক ক্ষতি হয় মস্তিষ্কে (brain)। সারাদিন মোবাইল ব্যবহার করলে আমাদের মস্তিষ্ক বিশ্রাম পায়না এবং মস্তিষ্কের ওপরে প্রচুর চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে প্রচুর সমস্যা দেখা যায়। যেমন, Loneliness, Rudeness, Depression, Boredom ইত্যাদি। এছাড়াও মন খারাপ, সব সময় রাগ রাগ ভাব, কোনো কাজে মন দিতে না পারা,অলসতা এমন অনেক সমস্যা দেখা যায়। ব্যক্তিগত জীবন এবং সাথে শিক্ষা ও কর্মজীবন একেবারে নষ্ট হয়ে যায়।
এবার জেনে নিন কিভাবে আপনার সন্তানের মোবাইল আসক্তি কমাবেন।
১. আলাদা খেলার জায়গা রাখুন।
বর্তমানে মোবাইলে গেম(Mobile games) খেলা একটা নেশার মতোই। সন্তানেরা গেম খেলতে খেলতে একটা আলাদা ভার্চুয়াল জগতে(virtual world) প্রবেশ করে। তাই বাড়িতে খেলার একটা জায়গা রাখতে হবে। যেখানে সে কল্পনার ভিডিও গেমের জগৎ থেকে দূরে থাকবে। নিজের কল্পনাশক্তিকে পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য করে নিতে পারবে।
২. টিভি বা ফোন ব্যবহারের সময় নির্দিষ্ট করুন।
আপনার সন্তানকে বোঝাতে হবে যে দিনে যেন সে এক বা দুই ঘন্টার বেশি টিভি বা মোবাইল ব্যবহার না করে। সে ক্ষেত্রে টিভিতে প্যারেন্টাল লক (Parental Locking) সিস্টেম আছে, সেটা ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া কখনোই নিজের সন্তানের ঘরে টিভি লাগাবেন না। মোবাইল রাখার জায়গা যেন তার পড়ার টেবিলের আশেপাশে না থাকে।
৩. উপহার বা পুরস্কার দিন সন্তানকে।
আপনার সন্তান কোন ভালো কাজ করলে বা পরীক্ষায় ভালো নাম্বার পেলে তাকে পুরস্কার বা উপহার দেওয়া শুরু করুন। হতে পারে কোন দামি উপহার নয় তবে ছোট ছোট একাধিক উপহারও (Gifts For Childs) আপনার সন্তানের কাছে অনেক মূল্যবান রূপে ধরা দেবে। এতে করে সে ভালো কাজ করার বা পড়াশোনার প্রতি অন্যরকম একটা উদ্যম পাবে।
৪. দায়িত্ব দেওয়া।
সন্তানকে বিভিন্ন দায়িত্ব দিলে তার সেই কাজের প্রতি আগ্রহ ও কর্তব্যবোধ বাড়বে। বাড়িতে বাগানে গাছে জল দেওয়া, ফুল তুলে আনা, বাড়িতে কোন প্রস্তুত থাকলে তার যত্ন নিতে বলা এমন দায়িত্ব দিতে পারেন সন্তানকে। এতে করে আপনার সন্তানের মনও ভালো থাকবে এবং মোবাইলের প্রতি আসক্তিও কমবে।
৫. সন্তানের কাছে আদর্শ বাবা মা হওয়া।
ছোটরা যা দেখে তাই শেখে। এজন্য বাবা মায়ের ব্যবহার ও পারিপার্শ্বিক তাদের চিন্তাধারা গঠনে এবং মানসিক বিকাশে অনেকটাই ভূমিকা রাখে। পিতা-মাতারা যদি সন্তানের কাছে আদর্শ(Ideal) হিসেবে হয়ে উঠতে পারেন তাহলে সেই সন্তানরা অবশ্যই বাবা মায়ের মান মর্যাদা রাখার চেষ্টা করবে। সন্তানের পাশাপাশি বাবা-মাকেও অবশ্যই মোবাইল ফোনের ব্যবহার কমাতে হবে।
৬. আপনার সন্তানকে সময় দিন।
অনেক সময় দেখা যায় বাবা-মা সারাদিন কাজ কর্মের মধ্যে ব্যস্ত থাকেন এবং সন্তানকে সময় দিতেই ভুলে যান। একাকীত্ব কাটাতে সন্তান হাতে তুলে নেয় মোবাইল বা টিভি। তারপর একটা ভার্চুয়াল দেওয়া দুনিয়াতে সবাই কাটাতে কাটাতে সেটাকেই সর্বস্ব মনে করতে থাকে এবং বাস্তব দুনিয়া থেকে ছন্দ কেটে যায়। তাই অবশ্যই আপনার সন্তানকে সময় দিন, তার সাথে খেলুন, ভালবাসুন।
৭. মজার মজার বই পড়ান সন্তানকে।
ছোট থেকে আপনার সন্তানকে অনেক অনেক বই উপহার দিন পড়ার জন্য। প্রথম দিকে রূপকথার গল্প, পশু পাখির গল্প, এইগুলো বাচ্চারা পড়তে খুবই ভালোবাসে। আস্তে আস্তে মনীষীদের জীবনী, গোয়েন্দা গল্পের বই(Detective Books), মজার ঘটনা ইত্যাদি বিষয়ক বইও আপনার সন্তানকে পড়াতে পারেন। এতে করে আপনার সন্তানের বুদ্ধি ও মানসিক বিকাশ হবে।
এমন সব উপায় অবলম্বন করে আপনার সন্তানের মোবাইল আসক্তি কমিয়ে ফেলতে পারেন। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মোবাইলের প্রয়োজন হলে তার জন্য কিপ্যাড মোবাইল (Keypad Mobile) দিতে পারেন। এতে করে সোশ্যাল মিডিয়া যেমন Facebook, Instagram ও ইন্টারনেটের প্রতি আগ্রহ জন্মাবে না।

.jpg)



0 মন্তব্যসমূহ
কোনোরকম জিজ্ঞাসা বা মতামত থাকলে কমেন্ট করুন....